মহাবিশ্বের বিশালতা
মানুষের বোঝার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে মহাবিশ্ব আমাদের বোঝার বাইরে।
হ্যাঁ, এই মহাবিশ্ব বিশাল। কিন্তু এই "বিশালতা" ঠিক কতটা বিশাল?
এটি আপেক্ষিক। যখন একজন
জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলে যে কিছু একটা কাছাকাছি আছে, তখন তার অর্থ হতে পারে এটি কয়েক মিলিয়ন
কিলোমিটার দূরে (যখন তারা গ্রহাণুর কথা বলে) বা কয়েক ট্রিলিয়ন (তারকার জন্য) বা কয়েক কুইন্টিলিয়ন (গ্যালাক্সির জন্য)।
মহাকাশে ভ্রমণটা আমরা
শুরু করবো আমাদের এই বাংলাদেশ থেকে, যার আয়তন ১,৪৮,৪৬০ বর্গ কিমি, আয়তনে বিশ্বের
৯২তম রাষ্ট্র। আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহের মোট আয়তন ৯১,০০,৭২,০০০ বর্গ কিমি। এতে সহজের
অনুমেয় যে, আমাদের এই দেশটা পৃথিবীর তুলনায় কত ছোট একটি ভূখণ্ড। তবে এখানেই অবাক হওয়ার
কোন কারণ নেই। কারণ আমাদের যাত্রা এখান থেকে মাত্র শুরু।
পৃথিবী পৃষ্ঠ হতে আমরা
যদি মহাকাশের দিকে রওনা করি তাহলে প্রথমের আমরা যে বস্তুটির দেখা পাবো তা হলো চাঁদ(পৃথিবীরএকমাত্র উপগ্রহ)। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৩,৮৪,৪০০ কিমি দূরে। এটি মোটামুটি এমন একটা
দীর্ঘ দূরত্ব যে দূরত্বে প্রায় ৩০টি পৃথিবী পাশাপাশি বসতে পারে!
এরপর আসা যাক আমাদের
পৃথিবীসহ আটটি গ্রহ যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে মানে সূর্য এর কাছে। সূর্য
আমাদের থেকে চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ অর্থাৎ ১৫০ মিলিয়ন কিমি দূরে। সেটা কতদূর? আপনি
যদি পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যে একটি রাস্তা তৈরি করতে পারেন তবে সেখানে হাইওয়ে গতিতে
গাড়ি চালালে আপনার সূর্যে পৌঁছাতে প্রায় ১৭০ বছর সময় লেগে যাবে। অথবা একটি বাণিজ্যিক
জেট বিমানে এই পথ পাড়ি দিতে লেগে যাবে প্রায় ১৭ বছর।
যখন আমরা সৌরজগতের অভ্যন্তরে
বস্তুকে নিয়ে কথা বলি, তখন পৃথিবী-সূর্য দূরত্বকে এক ধরনের মহাজাগতিক মিটার স্টিক হিসাবে
ব্যবহার করা সুবিধাজনক। আমরা এটিকে astronomical unit, or AU বলি এবং এটিকে আন্তর্জাতিক
জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন ১৪৯,৫৯৭,৮৭০.৭ কিমি হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। বুধ, সূর্য থেকে
প্রায় ০.৪ AU এবং শুক্র প্রায় ০.৭ AU দূরে অবস্থিত।
আমাদের সৌরজগতে নেপচুন, সূর্য থেকে সবচেয়ে
দূরবর্তী গ্রহ যার দূরত্ব সূর্য হতে ৪.৫ বিলিয়ন কিমি, বা ৩০ AU। প্লুটো প্রায় একই দূরত্বে
রয়েছে। নিউ হরাইজনস (The New Horizons) মহাকাশযানটি ঘন্টায় ৫০,০০০ কিলোমিটারের বেশি
গতিতে চলা সত্ত্বেও সেখানে পৌঁছতে নয় বছরেরও বেশি সময় নিয়েছে।
কিন্তু আমরা যখন মহাবিশ্বের
আরও দূরের বস্তু সম্পর্কে আলোচনা করতে যাবো তখন এই astronomical unit, or AU ও তুলনামূলকভাবে
ক্ষুদ্র হয়ে আসবে। যেমন সূর্য ১.৪ মিলিয়ন কিমি প্রশস্ত এবং এর নিকটতম স্টার সিস্টেম
হলো আলফা সেন্টোরি (Alpha Centauri), যা ৪১ ট্রিলিয়ন কিমি
দূরে অবস্থিত। নক্ষত্রগুলো তাদের মধ্যকার দূরত্বের তুলনায় খুবই ছোট, আর এই কারণেই আমাদের
নক্ষত্রগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ নিয়ে আপাতত খুব বেশি চিন্তা করতে হচ্ছে না।
এ পর্যায়ে এসে আমরা
সুবিধার জন্য দূরত্ব পরিমাপের বিশাল একক ব্যবহার করবো, যেমন এক আলোকবর্ষ (Light
Years), মানে আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে। এক আলোকবর্ষ প্রায়
সাড়ে ৯(নয়) ট্রিলিয়ন কিলোমিটার এর সমান। আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণের জন্য এটি একটি উপযোগী
ইউনিট। আলফা সেন্টোরি ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে। ওরিয়ন নেবুলা সূর্য থেকে প্রায় ১,২৫০ আলোকবর্ষ
দূরে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রটি ২৬,০০০ আলোকবর্ষ দূরে এবং গ্যালাক্সিটি নিজেই
প্রায় ১২০,০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে একটি চ্যাপ্টা ডিস্ক। এ গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন
নক্ষত্র বা স্টার বিদ্যমান।
মিল্কিওয়ের নিকটতম বড়
গ্যালাক্সি হল অ্যান্ড্রোমিডা, যা আমাদের থেকে ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। এটি একটি
আকর্ষণীয় সংখ্যা কারণ এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির আকারে চেয়ে "কেবল" ২০ গুণ।
বেশিরভাগ গ্যালাক্সি আকার মোটামুটি কাছাকাছিই হয়ে থাকে।
মিল্কিওয়ে এবং অ্যান্ড্রোমিডা
হল দুটি বৃহত্তম গ্যালাক্সি যারা প্রায় ১০০টি গ্যালাক্সি গুচ্ছের মধ্যে বিদ্যমান যাকে
আমরা Local Group বলে থাকি। এটি প্রায় ১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে
রয়েছে। এমনকি এরকম আরও বিশালাকার গ্যালাক্সিগুচ্ছ রয়েছে, যাদেরকে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার
বলা হয়। সবচেয়ে কাছের বড়টি হল Virgo ক্লাস্টার, এতে ১,০০০টিরও বেশি গ্যালাক্সি রয়েছে,
যা আমাদের থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এখানে আপনারা খেয়াল করলে দেখতে
পাবেন এই বিশালাকার একক ‘আলোকবর্ষ’ টিও মিলিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে!
গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলি
তাদের সদস্যদের মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা একত্রে থাকে এবং তা কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ প্রশস্ত
হতে পারে। কিন্তু আমরা এখানেও থামতে পারছি না! আবার অনেকগুলো ক্লাস্টার জমাট বেঁধে
অন্য একটা কসমিক বস্তু গঠন করে, যাকে বলা হয় সুপারক্লাস্টার। The Virgo Cluster এবং
the Local Group ক্লাস্টার ল্যানিয়াকিয়া সুপারক্লাস্টারের অংশ, যার মধ্যে ১,০০,০০০
এরও বেশি গ্যালাক্সি থাকতে পারে এবং যা ৫০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত।
মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৬ বিলিয়ন বছর, তাই আপনি ভাবতেই পারেন যে আমরা সবচেয়ে দূরবর্তী যে বস্তুগুলি দেখতে পাচ্ছি সেগুলি মোটামুটি তত আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। কিন্তু মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে, যার ফলে দূরবর্তী বস্তু থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছানোর সময়ও দিন দিন বেড়ে চলছে, কারণ সে মহাজাগতিক বস্তুটিও যে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রসারণের কারণে, আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব (observable universe) এর বিস্তৃতি ৯০ বা তার বেশি বিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে অনুমান করা হয়!
দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাইরের অঞ্চলে স্থানের প্রসারণ আলোর বেগের চেয়ে বেশী বেগে ঘটছে। তাই এই সীমান্তের বাইরের কোনও কিছু থেকে আলো দৃশ্যমান মহাবিশ্বে কখনও প্রবেশ করতেই পারবে না কারণ সে আমাদের দিকে যতটা অগ্রসর হবে, তার চেয়ে দ্রুত আরও দূরে সরে যাবে। ফলে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সীমান্তটি একটি কৃষ্ণগহ্বরের সীমান্তের মত। একারণেই এই সীমান্তের ভেতরের অংশটিকে 'দৃশ্যমান' (observable) বলা হয় এবং সীমান্তটিকে 'মহাজাগতিক ঘটনা দিগন্ত' (Cosmological Event Horizon) বলা হয়।
দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাইরে সম্পূর্ণ মহাবিশ্বের প্রকৃত বিস্তার সম্পর্কে কোনও ধারণাই আমরা করতে পারি না। এটা অসীমও হতে পারে।
তাই স্বীকার না করে উপায় নেই যে, হ্যাঁ-মহাবিশ্ব আমাদের কল্পনার চেয়েও বিশাল। এবং তার তুলনায় আমরা এতই ক্ষুদ্র যে তা মস্তিষ্কের সকল হিসাবকে গুলীয়ে দিতে বাধ্য। কিন্তু এই ক্ষুদ্র পৃথিবীর ক্ষুদ্র মানুষ এই মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে হার না মেনে প্রতিনিয়ত গণিত, পদার্থবিদ্যা ও যুক্তি ব্যবহার করে এ মহাবিশ্বের রহস্য উম্মোচন করে যাচ্ছে।
আর এটিই আমাদেরকে বড় করে তুলছে।





0 মন্তব্যসমূহ